রবিবার, মার্চ ৩, ২০২৪ || ১১:৫৮:৪২ অপরাহ্ণ

তাজরিন ট্র্যাজেডির ১১ বছর পূর্তি: আমরা আহত তাই কেউ চাকরিতে নেয় না

স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকার আশুলিয়ায় ইতিহাসের ভয়াবহ তোা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১বছর পূর্তিতে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে পুড়ে যাওয়া কারখানার সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নিহত শ্রমিকদের পরিবার, আহত শ্রমিক, ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।

২০১২ সালে ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড এ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছিলো। এ ঘটনায় ১১১ জন শ্রমিক জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। আহত হন আরও অন্তত শতাধিক। যদিও নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

কারখানাটিতে ১ হাজার ১৬৩ শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় ৯৮৪ শ্রমিক সেখানে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও ভয়াবহ এ অগ্নিকান্ডে পুড়েছে কারখানার সকল মালামাল ও সম্পূর্ণ ভবনটি। সেই পুড়ে যাওয়ার ছাপ এখনো ভবনের চার পাশে লেগে আছে। সেদিনের পর থেকে ভবনটির কর্যক্রম একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলেও পুড়ে যাওয়া ৮ তলা ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে দাড়িয়ে আছে। ভবনটি নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন ভবনের আশে পাশের বাসিন্দারা।

শুক্রবার সকাল থেকে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরিন ফ্যাশনসের প্রধান ফটকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান শিল্প-পুলিশ। এরপরেই শ্রদ্ধা জানান, ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স (ইউএফজিডব্লিউ) এর সাভার আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোঃ ইমন শিকদার, বাংলাদেশ গার্মেন্টস এন্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলমগীর শেখ লালন, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ ঈসমাইল হোসেন ঠান্ডু, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোঃ তুহিন চৌধুরী, আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ কবির হোসেন, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক মোঃ মাহবুব আলম বাচ্চু, সাভার আশুলিয়া অঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক শেখ আল মামুন বিপ্লবসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

আহত শ্রমিক নাসিমা আক্তার বলেন, আমার মেরুদন্ডের হার ভাঙ্গা। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন পঙ্গুত্ব নিয়ে বাঁচতে হবে। বর্তমানে আমি একটি ঝুটের গোডাউনে দিনে দৈনিক ২০০ টাকার বিনিময়ে কাজ করি। সেখানে যেতে আমি বাধ্য হয়েছি। কারণ অন্য আমার চাকরি হচ্ছিল না। আমি অনেক ফ্যাক্টরির সামনে গিয়েছি। তাই আমার দাবি ন্যায্য ক্ষতি পুরণ ও দীর্ঘ মেয়াদী সুচিকিৎসার দেওয়া হোক।

আহত আরেক শ্রমিক রেহেনা আক্তার বলেন, আগুন থেকে বাঁচতে লাফিয়ে পরে আমার মেরু দন্ডের হাড় ভাঙ্গে যায়। আমি কোনো কাজ করতে পারি না। ছেলে মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। আমার ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করাইতে পারছি না। অন্য কোথাও চাকরিও হচ্ছে না। আমরা আহত তাই কেউ চাকরিতে নেয় না। আমার চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়। তাই আমার দাবি চিকিৎসা দিলে ভালো মত দেওয়া হোক। সেই সাথে সরকারের কাছে আবেদন আমাদের দ্রুত ক্ষতি পুরণটা দেওয়া হোক।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন বলেন, ১১ বছর পার হলেও তাজরীনের ঘটনায় কোনো বিচার হয়নি বরং পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি মালিক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনকে ঢাকা মহানগর উত্তর মৎস্যজীবী লীগের সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে। এটা একধরনের পুরস্কার। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে বলা হচ্ছে সাক্ষী পাওয়া না যাওয়ায় মামলা শেষ করা যাচ্ছে না। অথচ আহত শ্রমিক, স্থানীয়সহ সবাই আছেন সাক্ষ্য দিতে। এটি একধরনের বিচার না করার অজুহাতমাত্র। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আগুন লাগার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ গেটে তালা লাগিয়ে শতাধিক শ্রমিককে পুড়িয়ে হত্যা করেন। এ ঘটনার এখনো দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি।

তিনি বলেন, অবিলম্বে তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে পুড়ে যাওয়া ভবনটি সংস্কার করে শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স (ইউএফজিডব্লিউ) এর সাভার আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোঃ ইমন শিকদার বলেন, তাজরীন ট্রাজেডি আজ ১১বছর পার হয়ে গেলেও এখনও এই ঘটনায় খুনি দেলোয়ারসহ জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি হয়নি। তাই তাদেরকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হোক। এছাড়া আহত ও নিহতদের পরিবারের অনেকেই যথাযথ সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তারা আজও দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। তাদের জন্য পূর্নবাসনসহ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার দাবী জানান তিনি।

বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ কবির হোসেন বলেন, তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার এক যুগ হয়ে গেলেও আহত শ্রমিক ও নিহতদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাইনি। অনেক ভাই-বোন অসুস্থ অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। এখনও অসুস্থতা নিয়ে অনেক শ্রমিক কষ্টে দিন পার করছে। অবিলম্বে কারখানার মালিক দেলোয়ারের শাস্তিসহ তাদেরকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানাই।

শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, তাজরিন অগ্নিকান্ডের ঘটনা একটি বেদনাদায়ক ঘটনা। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত রিপোর্ট বিজ্ঞ আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। বিচারকাজ যাতে তরান্বিত হয় সেদিকেও আমরা নজর রাখছি। আমাদের সব রকমের প্রচেষ্টা থাকবে। এই ঘটনা আমাদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ইন্ডাস্ট্রি করার ক্ষেত্রে কোন বিষয় গুলোকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ সেসব বিষয় খেয়াল রাখছি।
এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাজরিনে হতাহত শ্রমিকদের স্মরণে পুড়ে যাওয়া কারখানার সামনে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তোবা গ্রুপের তাজরিন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কারখানার ভিতরে আগুনে পুড়ে মারা যায় ১১১জন শ্রমিক। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন আরও ৭ শ্রমিক। এঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ব নিয়ে জীবন যাপন করছেন আরও প্রায় শতাধিক শ্রমিক।

খবরটি শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *